Chanakya biography and all about his life

মহাত্মা চানক্যের জীবনী

প্রায় দু' হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। তক্ষশিলা নগরের এক ব্রাহ্মন পরিবারে জন্মগ্রহন করেন মহাত্মা চানক্য। তাঁর পিতার নাম ছিল চানক তিনি ছিলেন পরম ধার্মিক ও ঋষি। পিতার নামানুসারে পুত্রের নাম করন হয় চানক্য। তিনি কেবল নীতি শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন না, ছিলেন অসাধারন কুটনীতিজ্ঞ। সে কারন তিনি কৌটিল্য নামে ও মগধে খ্যাত ছিলেন। বিষ্ণু সিদ্ধান্ত নামে একখানি জ্যোতিষ শাস্ত্র লিখে তিনি বিষ্ণুশর্মা চানক্য নামে অভিহিত হন। চানক্য ও কৌটিল্য নাম তাঁর অধিক প্রচলিত।

চানক্যের ক্রোধ ছিল প্রচন্ড। তিনি নিজেকে পৃথক ও প্রধান বলে মনে করতেন। ছােটবেলা থেকে ঠাকুর দেবতা ও শাস্ত্রপুরানের প্রতি ঐকান্তিক মন ছিল। গৌর অবতারের দেড় হাজার পূর্বে তিনি বলেছিলেন ঠাকুর আসছেন কলিহত অনাচারী জীবের পরিত্রানের জন্য তিনি অবশ্যই স্বােদ অবতার হবেন। শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ে কেউ কোন অহিতকর কথা বললেইশাস্ত্র শ্লোকের মাধ্যমে তিনি তাকেপরাজিত করতেন। তিনি ছিলেন ঈশ্বরের পরম ভক্ত। অন্যায়কে আদৌ মান্য করতেন না। আর তাঁর ক্রোধ ছিল বলেই উন্নতির চরম শিখরে উন্নিত হতে সক্ষম হয়েছেন। সে বিষয়ে যে মজার কাহিনী আছে, আসুন আমরা শ্রবন করি। 

একদা তিনি পথিমধ্যে ভ্রমনকালে পায়ের তলায় কুশের কাটা বিদ্ধ হয়ে বসে পড়েন। তার পায়ে রক্তপাত হতে দেখে তিনি প্রচণ্ডভাবে ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে মাটি খুঁড়ে তিনি কুশের মূল পর্যন্ত উপড়ে ফেলতে থাকেন। পুনরায় যাতে কুশ গাছ না জন্মায় তার জন্য জল গরম করে তাতে ঢালতে থাকেন। সেই সময়ে সে পথ দিয়ে যাত্রা করছিলেন নন্দ বংশের সম্রাট ধননন্দের মন্ত্রী শকটার। 

শােনা যায় ধননন্দ শকটারের সাথে প্রায়ই সময় খারাপ ব্যবহার করতেন। রাজার প্রতি প্রতিশােধ গ্রহনের জন্য শকটার অনেকদিন ধরে যে কোন উপায় অন্বেষন করাহনে। কিন্তু কোন সুযােগ পাচ্ছিলেন না। কেবল অপমানিত হয়ে আসছিলেন। এই ব্রহ্মাকে দেখে তিনি সময়ের সদ্ব্যবহারের কথা ভাবতে থাকেন।

 এদিকে ধননন্দের পিতা মারা গিয়েছিলেন এবং কয়েকদিনের মধ্যে তার বাৎসরিক শ্রাদ্ধের জন্য একজন বিচক্ষন শাস্ত্রও পন্ডিতকে ডেকে আনার জন্য আদেশ করলেন। শকটার সেই উদ্দেশ্যে বাহির হয়েছেন। তিনি ব্রাহ্মনের কীর্তিকলাপগুলাে দেখে জিজ্ঞাসা করেই সৰ কথা অবগত হলেন। তিনি বুঝেও নিলেন যে আমার উদ্দেশ্য সফল করার পক্ষে একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি চানক্য। একে যদি কোন প্রকারে ধননন্দের উপর ক্ষিপ্ত করাতে পারি তাহলে প্রতিশােধের কামনা ব্যর্থ হবে না। সাত পাঁচ চিন্তা করার পর শকটার চানক্যকে নিমন্ত্রন করে গেলেন ধননন্দের পিতার বাৎসরিক শ্রাদ্ধে পৌরােহিত্য করার জন্য।

চানক্য চারদিন পরে যথাসময়ে পৌরােহিত্য কাজের জন্য রাজবাড়ীতে এসে উপনীত হলেন। 

ধননন্দ শকটারকে পন্ডিত আনতে আদেশ করেছিলেন সত্য, কিন্তু শকটারের উপর তাঁর কোন প্রকার বিশ্বাস ছিল না, তাই তিনি তার অপর মন্ত্রী রাক্ষস বর্মনকে একজন ভাল ব্রাক্ষন আনার কথা বলেছিলেন। যথারীতি তিনি ও একজন ব্রাহ্মন নিয়ে এসে দেখেন তার আসার আগেই একজন পন্ডিত এসে পুরােহিতের আসনে বসে আসেন, মন্ত্রী রাক্ষস বর্মন রাজা ধননন্দকে শকটারের কথা জানালেন। 

রাজা সব কথা শুনে দুতকে আদেশ দিলেন শকটারের আনিত ব্রাহ্মনের চুলের মুঠি ধরে সভা থেকে বের করে দেবার জন্য। দুত তাই করতে গেলে তিনি সভার মাঝে অগনিত লােকের সামনে অপমান বােধ করে ধননন্দের উপর প্রচন্ডভাবে রেগে গেলেন। ক্রোধাগ্নিতে জুলে উঠে তিনি রাজসভায় উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাপতে নিজের মাথার শিখা খুলে ধননন্দকে বললেন- মহারাজ! মদগর্বে গর্বিত হয়ে পিতৃশ্রাদ্ধ কালে তুমি যে ভাবে আমাকে অপমান করলে- আমি যদি যথার্থ ব্রাহ্মন হই, শাস্ত্র এবং নিষ্ঠাবান হই তবে এর উপযুক্ত প্রতিফল তুমি পাবে। আরও শুনে রাখ দাম্ভিক রাজা, রাজসভার মাঝে আমি আমার শিখা খুলে দিলাম, যতদিন আমি নন্দবংশ ধ্বংশ করতে না পারব ততদিন আমি আর শিখা বন্ধন করব না। এই কথাগুলি বলে তিনি ধননন্দের রাজসভা ত্যাগ করলেন।

 এই মর্যাদাহীন ঘটনার পর শকটার মিলিত হন কুটনীতিবিদ পন্ডিত চানক্যের সাথে। নন্দবংশ কিভাবে ধ্বংশ করা যায়, কিভাবে রাজসিংহাসন আয়ত্ব করা যায় সেই উপায় খুঁজতে থাকেন। 

সেইকালে তাদের এক বড় সুযােগ এলাে। চন্দ্রগুপ্ত নামে এক জ্ঞানী, শক্তিশালী ও সাহসী বীর যুবক ছিলেন নন্দ বংশের সন্তান। কেউ কেউ বলেন তিনি ছিলেন শূদ্রবংশজাত এবং তার মা ছিলেন মুরা-নন্দরাজার উপপত্রী। তাঁর মায়ের নামানুসারে বীর চন্দ্রগুপ্তকে বলা। হতাে মৌর্য্য।

 গ্রীক লেখক জ্যাষ্টিন বলেছেন- চন্দ্রগুপ্ত জন্মগত করেছিলেন সাধারন পরিবারে। বৌদ্ধ ও জৈন গলে উল্লেখ আছে- চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন পিপ্পলী বনের মােরিয় ক্ষত্রিকায়। কারন ক্ষত্রিয় মােরিয় বংশের শাসক ছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের পিতা। মগধ সম্রাট ধননন্দ তাঁকে হত্যা করেছিলেন। তাই পিতৃহত্যার প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য চন্দ্রগুপ্ত সুযােগ খুঁজছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত ও চানক্যের সাথে মিলিত হলেন। চানক্য, শকটার এবং চন্দ্রগুপ্ত তিনজন মিলিত হয়ে নন্দবংশের ধ্বংশ কার্যে মন্ত্রনা করেন। 

 তখন শ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডারের কাছে যুদ্ধবিদ্যা। শিক্ষা করেন চন্দ্রগুপ্ত। পরে চানক্য ও শকটারের মিলিত চেষ্টায় শক্তি সংগ্রহ করে ধননন্দকে আক্রমন করেন। যুদ্ধে ধননন্দ পরাজিত ও নিহত হলেন। চানক্য কৌশলে তার প্রতিশােধ নিয়ে ধ্বংশ করলেন নন্দবংশ। তারপর তিনি প্রতিভামত শিখা বন্ধন করে বীর চন্দ্রগুপ্তকে বসালেন মগধের সিংহাসনে এবং নিজেই হলেন তার। প্রধান মন্ত্রী।

চানক্যের মন্ত্রনাবলে চন্দ্রগুপ্তের মগধ সাম্রাজ্য ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হতে থাকে। তিনি তখন যবন ও চ্ছেদের পরাজিত করলেন। তার সুশাসনে রাজ্যের সর্বত্র শান্তি ও মঙ্গল বিরাজমান। 

চন্দ্রগুপ্তের এতবড় সাফল্যের পশ্চাতে যদি কেউ কতিত্ব দাবি করেন তবে তিনি হলেন একমাত্র পন্ডিত চানক্য। পন্ডিত চানক্যের মন্ত্রনা বলে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। চানক্য পন্ডিত চন্দ্রগুপ্তকে মগধের সিংহাসনে বসিয়ে কিছুকাল ভালভাবে রাজত্ব চালানর পর মন্ত্রীত্বপদ ত্যাগ করে তপস্যার জন্য বনগমন করেন। 

পন্ডিত চানক্য নানান কথা আলােচনার মাধ্যমে প্রায়ই বলে থাকতেন- ধনে হীনা পশুভিসমানা। সকলের উদ্ধে একমাত্র সত্য হল ধৰ্ম্ম। ধপথে থাকি কর জীবন যাপন ভাই। 

 পন্ডিত চানক্যের জীবনকাহিনী সংক্ষিপ্তাকারে আলােচনা করা হল। এবার আমরা শ্রবন করব তারই কথিত মূল্যবান নীতি কথা গুলি পরের পাঠ গুলিতে।

Post a Comment

0 Comments