Indira Gandhi - Former Prime Minister of India Biography


ভারতরত্ন ইন্দিরা

 তখন ১৯৩৪ সাল। শান্তিনিকেতনের একটি ঘটনা। কলাভবনের নন্দনে ভারতীয়। শিল্পরীতির সম্পর্কে বক্তৃতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বক্তা একজন ইংরাজ অধ্যাপক। 

কলাভবনে জুতাে পরে প্রবেশ নিষেধ । কিন্তু উক্ত অধ্যাপকের পায়ে জুতাে। ছাত্রছাত্রীরা বিস্ময়ে স্তব্ধ, হতবাক । এমন ঘটনা এই প্রথম। নন্দন পুণ্য পবিত্রতার প্রতীক । আশ্রমের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী থেকে আরম্ভ করে অধ্যাপকদের সকলেরই জানা যে কলাভবনে জুতাে পরে ঢােকা। একটি গর্হিত অপরাধ । অথচ...

এইদিকে সর্বপ্রথম দৃষ্টি আকর্ষিত হলাে একজন ভারতীয় ছাত্রীর । সে উঠে দাড়িয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অধ্যাপককে অনুরােধ জানালেন জুতাে বাইরে রেখে আসতে। কিন্তু বিদেশী ইংরেজ অধ্যাপকের মর্যাদায় বাধল। তিনি মেয়েটির কথায় কান না দিয়ে বক্তৃতা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

ছাত্রীটি আবার অনুরােধ জানালাে, স্যার, আপনি দয়া করে জুতাে বাইরে খুলে আসুন।

 কিন্তু এতেও অধ্যাপক অনড় । এবার কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ল । তারা। ক্লাস বয়কট করে বাইরে বেরিয়ে এল । নিমেষে শ্রেণীকক্ষ ফাকা হয়ে গেল। তখন ইংরাজ অধ্যাপক বাধ্য হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। 

এই ভারতীয় ছাত্রী হলেন আমাদের ইন্দিরা । ভাবীকালে তিনি যে দেশের একজন নেত্রী হবেন তার আভাস আমরা তখন থেকেই পাই । ১৯১৭ সালের ১৯শে নভেম্বর এলাহাবাদে ইন্দিরার জন্ম। পিতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। মা কমলাদেবী। ইন্দিরা সুন্দরী, লাবণ্যময়ী । তাই আদর করে বাবা তাকে ডাকেন প্রিয়দর্শিনী । ছােটবেলা থেকেই নির্জনতা ভাল লাগে ইন্দিরার। ভাল লাগে পুতুলখেলা, ঘােড়ায় চড়া। আনন্দভবনে রয়েছে ঘােড়ার আস্তাবল । পিসি, বাবা ঘােড়ায় চড়েন। ইন্দিরাও শিখে নিল। পণ্ডিত ও বনেদী বংশের লােক হয়েও নেহরু পরিবার ছিল সবরকমের কুসংস্কার মুক্ত। পৃথিবীর আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে তারা পরিচিত । জাতিভেদ মানেন না। হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টান, সকলেরই সমান প্রবেশাধিকার আনন্দভবনে। এক ইংরাজ মহিলাকে রাখা হলাে ইন্দিরার লেখাপড়ার জন্য। তার কাছে ইন্দিরা লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিখল আদবকায়দা, আচার ব্যবহার। পুনেতে প্রথম স্কুল জীবন শুরু হয় ইন্দিরার। ১৯৩৪ সালে বােম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলেজ জীবনের শিক্ষা । শান্তিনিকেতন ও কবিগুরুর নাম শুনেছিলেন ইন্দিরা । তার খুব ইচ্ছে হলাে শান্তিনিকেতনে থেকে পড়াশুনা করবেন । চলে। এলেন শান্তিনিকেতনে । নতুন পরিবেশে নতুন এক জীবন । এই আশ্রমিক পরিবেশে ইন্দিরা যেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন । অতি আধুনিক বিদেশীয় শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত। হবার পর নতুন এই আশ্রমিক শিক্ষায় ইন্দিরা পেলেন এক অভিনব স্বাদ। খুব অল্পদিনের মধ্যেই সকলের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠলেন ইন্দিরা। তার মধুর ব্যবহার, শেখার আগ্রহ ও উৎসাহে সকলের মন জয় করে নিলেন তিনি। নাচ, গান, নাটক, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি সব বিষয়েই তার সমান আগ্রহ । কবিগুরু তাকে কাছে ডেকে আশীর্বাদ করলেন, উৎসাহ দিলেন। শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথ দুই খুব প্রিয় ছিল ইন্দিরার। তাই দেখি শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার পরেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি ইন্দিরার। নিয়মিত পত্রালাপ চলতাে। পিতা জওহরলালেরও খুব প্রিয় ছিল শান্তিনিকেতন । তাই পরবর্তীকালে পৌষমেলা উপলক্ষে বা এমনি সময়েও পিতার সঙ্গে বহুবার তিনি চলে গেছেন শান্তিনিকেতন । ইন্দিরার পরবর্তী শিক্ষাজীবন সুইজারল্যান্ডে। তারপর অক্সফোর্ডের সামারভিল কলেজে। এই সময়ে ইন্দিরার জীবনে ঘটল এক শােকাবহ ঘটনা । মা কমলা নেহরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে। পড়লেন। ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি। জার্মানিতে চিকিৎসাধীন আছেন কমলা। শিয়রে জওহরলাল ও ইন্দিরা । ডাক্তার ঘন ঘন পরীক্ষা করছেন রুগীকে । কিন্তু কিছুই করা গেল না। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন কমলা। মায়ের মৃত্যুর পর পড়াশুনার জন্য লন্ডনে ফিরে এলেন ইন্দিরা। 

কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় অক্সফোর্ডের পড়াশুনাে শেষ হলাে না ইন্দিরার। ১৯৩৮ সালে। পক্ষাঘাতে ঠাকুরমার মৃত্যু, ১৯৩৯ সালে নিজে প্লুরিসিতে আক্রান্ত হলেন ইন্দিরা। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল সমগ্র ইউরােপ জুড়ে। তাই ইন্দিরা ঠিক করলেন আর নয়, এবার দেশে ফিরতে হবে । পিতা জওহরলাল তখন জেলে। ১৯৪১ সালে ইন্দিরা দেশে ফিরে এলেন। সঙ্গে ফিরােজ গান্ধী। তিনিও বিলেতে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরছেন ।

 ভারতে তখন স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার বইছে । ইংরাজ সরকারের দমননীতি, পুলিসী অত্যাচারকে অগ্রাহ্য করে হাজারে হাজারে ভারতবাসী ঝাপিয়ে পড়ছে স্বদেশের মুক্তি সংগ্রামে। গান্ধীজীর মন্ত্রশিষ্য জওহরলাল তাে অনেক আগেই নেমে পড়েছেন। এবার ইন্দিরাও নেমে পড়লেন। ইতিমধ্যে ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে ফিরােজ গান্ধীকে জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে। নিয়েছিলেন ইন্দিরা।এলাহাবাদের আনন্দভবনেই সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই এই শুভবিবাহ। অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দুজনেই ঝাপিয়ে পড়লেন দেশের মুক্তিসংগ্রামে।

  ইন্দিরা ভাল বক্তা। নানা জায়গায় সভা সমিতির মাধ্যমে দেশের যুবশক্তি ও নারীশক্তিকে সংগঠিত করে তুলতে লাগলেন তিনি। শাসকশ্রেণীর দৃষ্টি পড়ল ইন্দিরার উপর। তারা পার সষ্টি করলেন নানাভাবে। কিন্তু ইন্দিরাকে দমানাে গেল না কিছুতেই। সঙ্গে আছেন ফিরােজ। গান্ধী। দু’জনেই কারাবরণ করলেন। নৈনি জেলে নিয়ে যাওয়া হলাে ইন্দিরা ও ফিরােজকে। জেলে গিয়েও কিন্তু ইন্দিরা বসে থাকেন নি। জেল কর্তৃপক্ষের কাছে সম্মতি নিয়ে জেলের। নিরক্ষর কয়েদিদের লেখাপড়া শেখাবার কাজে লেগে গেলেন। শুনলেন সকলের সুখ-দুঃখের কথা। তার মন ভরে ওঠে সহানুভূতিতে। ভাবেন প্রতিকারের কথা । ভাবেন সমাজের নানা , অন্যায় অবিচার দূর করার কথা । দেখতে দেখতে কারাবাসের মেয়াদ শেষ হলাে। ইন্দিরা ও ফিরােজ ফিরে এলেন এলাহাবাদে। এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন। জন্ম হলাে রাজীব আর সঞ্জয়ের । ইতিমধ্যে ইন্দিরার মন পরিপুষ্ট হয়েছে বাস্তবের নানা অভিজ্ঞতায় । পিতা জওহরলালের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে স্বদেশের ও বিদেশের নানা স্থানে পরিভ্রমণ করেছেন। ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ইংলন্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি, রাশিয়া। পূর্ণ হয়েছে নানা অভিজ্ঞতার ঝুলি ।

 অবশেষে এলাে ১৯৪৭ সাল । ভারত স্বাধীন হলাে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আর তখন থেকেই ইন্দিরা পিতার সমস্ত কাজের সহযােগী। রাজীব ও সঞ্জয়কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে স্কুল-বাের্ডিং-এ। কাজেই দেশের ও দশের কাজে সম্পূর্ণভাবে। আত্মনিয়ােগ করলেন ইন্দিরা । দাঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চলে সেবাকার্য, পিতার সঙ্গে কমনওয়েলথ প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে গমন এবং ১৯৪৯-এ রাষ্ট্র সফর। সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ইন্দিরা সিদ্ধহস্ত। ১৯৫৩ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাতৃপদক পুরস্কার পেলেন তিনি।

১৯৫৫ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হলেন ইন্দিরা। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ধনী-দরিদ্র উচ্চ-নীচ কোনাে ভেদাভেদ তিনি মানতেন না। পাশ্চাত্য শিক্ষাধারায় অভ্যস্ত হলেও ভারতীয় সভ্যতা ও কৃষ্টিকে তিনি সকলের উধ্বে স্থান দিয়েছেন। তার আদর্শ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। ১৯৫৯ সালে ইন্দিরা কংগ্রেস সভাপতির পদ লাভ করেন। সভাপতি হলেও ইন্দিরা সমাজ সেবিকা, ইন্দিরা কর্মী । দ্বারে দ্বারে। ঘুরে সাধারণ ও গরিব ঘরের লােকদের সঙ্গে কথা বলে জানলেন তাদের সুখ-দুঃখের কথা । অভাব অভিযােগের কথা। জনজীবনের সঙ্গে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ স্থাপিত হলাে।

  ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলন থেকে ফেরার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে এসে খবর পেলেন ফিরােজ গান্ধী অসুস্থ । বিমান বন্দর থেকে সােজা ইন্দিরা চলে গেলেন স্বামীর কাছে। আর সুস্থ হলেন না ফিরােজ। অনেক চেষ্টা হলাে। কিন্তু সব ব্যর্থ করে। দিয়ে ফিরােজ চলে গেলেন। শশাকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন ইন্দিরা । কিন্তু শীঘ্রই তা কাটিয়ে। উঠলেন। শােকে ভেঙে পড়লে তার চলবে না। অসংখ্য কাজ তার সামনে। 

তিনমূর্তি ভবন ছিল সারা বিশ্বের মিলনতীর্থ। পৃথিবীর বড় বড় নেতারা এই ভবনে এসেছেন। আইজেনহাওয়ার, চৌ-এন-লাই, টিটো, বুলগানিন, ক্রুশ্চেভ, নাসের, রুজভেল্ট প্রভৃতি ব্যক্তিরা এই ভবনে মিলিত হয়েছেন নেহরুর সঙ্গে। ইন্দিরা এঁদের সঙ্গে পরিচিত। হয়েছেন। পিতার সঙ্গে বিশ্বের নানা দেশ পরিভ্রমণ করেছেন। ফলে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয় পূর্ণ হয়েছে। সুদূরপ্রসারী এবং বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারিণী হয়েছেন ইন্দিরা । 

১৯৬৪ সালে ভুবনেশ্বরে হঠাৎ হৃদরােগে আক্রান্ত হলেন জওহরলাল । এবং সে আঘাত তিনি আর সামলাতে পারলেন না। ২৭শে মে তিনি পরলােকগমন করেন। পিতার মৃত্যুতে একেবারেই ভেঙে পড়লেন ইন্দিরা। তিনি ছিলেন তাঁর জীবনে ধ্রুবতারা স্বরূপ—একমাত্র আলাের দিশারী। গুরু, উপদেষ্টা, পথপ্রদর্শক। তবুও সামলে নিলেন তিনি। -

জওহরলালের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি ইন্দিরাকে জানেন। বিশ্বাস করেন তার একনিষ্ঠতাকে, কর্মক্ষমতাকে । মন্ত্রীসভায় ইন্দিরা পেলেন চতুর্থ স্থান । বেতার ও তথ্যবিভাগ। নিজের বিভাগ ছাড়াও যখনই যেখানে কোনাে সংকট দেখা দিয়েছে সেখানে। ছুটে গেছেন ইন্দিরা। নিপুণ হাতে সমস্যার সমাধান করেছেন।

  ১৯৬৬ সালের ১১ই জানুয়ারি তাসখন্দে আকস্মিকভাবে পরলােকগমন করেন লালবাহাদুর । 

তারপর এলাে সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ১৯৬৬ সালের ২৪শে জানুয়ারি। ভারতের। প্রধানমন্ত্রীরূপে শপথ নিলেন ইন্দিরা । দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে তিনি অধিষ্ঠিতা ছিলেন। আর এই। দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি তিনি মুহূর্ত নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন কাজে। ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রীয়করণ, সােভিয়েটের সঙ্গে শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি, এশিয়াড ইত্যাদি নানা উল্লেখযােগ্য কাজ তিনি সমাধা। করেছেন। ভারতবাসী তাই তাকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সারা বিশ্বে যে। কজন প্রধানমন্ত্রী তাদের যােগ্যতার পরিচয় রেখেছেন ইন্দিরা তাদের অন্যতম ।

  অবশেষে ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর দেহরক্ষীর গুলিতে আহত হন নিজের বাসভবনে । সঙ্গে সঙ্গে তাকে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি পরলােকগমন করেন।

Post a Comment

0 Comments