King of Fox - A motivated story


ব্যাঙের রাজা

একটা নয়, দুটো নয়, এমনকি একশাে দুশাে-ও নয়। হয়তাে হাজার বা দু- মহাজার অথবা তারও বেশি হতে পারে। যেন একেবারে সাত রাজ্যের ব্যাঙ এসে জুটেছে ফাঁকা মাঠের মাঝখানে এই মস্ত জলাটার ধারে। কোলাব্যাঙ, ভােলাব্যাঙ, সােনাব্যাঙ, কুনােব্যাঙ, মেঠোব্যাঙ, চিতেব্যাঙ, কটুকিব্যাঙ-ব্যাঙে আর ব্যাঙাচিতে গােটা জলাটা ছয়লাপ একেবারে। কোন্ আদ্যিকাল থেকে এরা। এখানে বাস করছে, কে জানে! 

সত্যিই তাে, এমন একটা নিরাপদ সুখের জায়গা আর পাওয়া যাবে কোথায়? আশেপাশে কোনও গ্রাম কি ঝােপ-জঙ্গল পর্যন্ত নেই। যতদূর দেখা যায়, কেবল জল আর মাঠ আর আকাশ। এমন মনের মতাে জায়গা পেয়ে লাফিয়ে ঝুঁপিয়ে কাঁপিয়ে গান গেয়ে আনন্দে দিব্যি দিন কাটিয়ে দেয় তারা।

 জলার ধারে নিত্যি সন্ধেবেলা তাদের গানের আসর বসে। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ,। গ্যাঙোর গ্যাঙ, কটর কট—কত রকম তাদের সুর ভঁজা আর গলা সাধা। আর বর্ষাকাল এলে তাে কথাই নেই। মাঠের ধারে কালাে হয়ে মেঘ উঠতে দেখলেই। অমনি গলায় সর এসে যায় তাদের। তারপর যখন চারদিক অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে, ব্যাঙদের তখন ফুর্তি দেখে কে! সারারাত ধরে। তাদের জলার জলসা আর থামতেই চায় না।

এই নিয়ে ব্যাঙদের মধ্যে একদিন জোর তর্ক বেধে গেল। একটানা বৃষ্টি। চলেছে কয়েকদিন ধরে, আকাশে একফোটাও রােদের দেখা নেই। এদিকে। অবিরাম ডাকতে ডাকতে কয়েকশাে ব্যাঙের তাে গলা ভেঙে গেল একেবারে। রীতিমতাে অসুস্থ হয়ে পড়ল আরও কয়েকশাে ব্যাঙ। বুড়াে ব্যাঙগুলাের তাে ! কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়। মােটাসােটা ভারিক্কি চেহারার একটা কোলাব্যাঙ শেষকালে বিরক্ত হয়ে জোর ধমক লাগাল, এ্যাই, তােরা থামবি সব? নাকি গানের চোটে রাজ্যিটা ভাসিয়ে দিবি একেবারে ? -ধমক খেয়ে সবাই অমনি গান থামিয়ে দিল বটে, কিন্তু এক ছােকরা সােনাব্যাঙ বলে উঠল, আমাদের দোষ কী? বৃষ্টি থামলে তবে তাে গান থামাব আমরা। 

কোলাব্যাঙটা রেগে থপথপিয়ে খানিকটা এগিয়ে গেল তার দিকে। দু-চোখ পাকিয়ে ভেংচি কেটে বলল, ক ছোঁড়ার কী পাকা বুদ্ধি! বলি, দয়া করে গান না [ থামালে বৃষ্টিটা থামবে কী করে শুনি? 

এ তাে এক মহা মুশকিল! দেখতে দেখতে এই নিয়ে একেবারে জোর তর্ক বেধে গেল ব্যাঙদের মধ্যে। আগে বৃষ্টি থামবে, নাকি আগে গান? একদল বলে, বৃষ্টি থামলেই গান থামানাে নিয়ম। অন্য দলের মতে, গান থামালেই বৃষ্টি থেমে যাবে। কিছুতেই আর তর্কের শেষ হয় না। তাই দেখে এক ভুলােব্যাঙ আপনমনে বলে উঠল, আমাদের যদি একজন রাজা থাকত, তাহলে এত ঝামেলা হত না। কথাটা সকলেরই খুব মনে ধরল। সত্যি তাে, একজন রাজা থাকলে আর কোনও ভাবনা থাকে না। সেই সব ঠিক করবে তখন, আর কাউকে কিচ্ছ ভাবতে হবে না। কী আশ্চর্য, কথাটা এতদিন কারও খেয়ালই হয়নি।

 ধাড়ি ব্যাঙটা তখন কটর-কটর করে পরামর্শ দিল, ঠিক আছে, আমরা তাে ইন্দ্ৰঠাকুরের প্রজা। চলাে, তার কাছেই যাই। তিনিই আমাদের রাজা ঠিক করে দেবেন।

বেশ একজন চালাক চটপটে বাঘাব্যাঙকে বেছে সবাই মিলে তাকে পাঠাল ইন্দ্রের কাছে। ইন্দ্র তাে প্রথমে হেসেই উড়িয়ে দিলেন ব্যাপারটা। বললেন, হঠাৎ আবার রাজার কী দরকার পড়ল তােমাদের? তােমরা তাে সবাই রাজা তােমাদের ওই রাজার রাজত্বে। নতুন রাজা আর লাগবে না।

বাঘাব্যাঙ তখন ইনিয়েবিনিয়ে বলতে লাগল, পৃথিবীতে সব জাতেরই এক একজন রাজা আছে, প্রভু। আমাদের তেমনি একজন রাজা না থাকলে তাে আর মান থাকে না। ইন্দ্রদেব খুব মজা পেলেন তার কথা শুনে। ভারী সরল আর নিরীহ প্রাণী এই ব্যাঙগুলাে। না হলে এমন আজগুবি আবদার করে কেউ! তা এত যখন সাধ। হয়েছে ওদের, ইন্দ্র আর না করতে পারলেন না। একটা রাজা পেলে যদি ওরা খুশি হয় তাে হােক না। হাসিমুখে বললেন, আচ্ছা, তুমি যাও। শিগগিরই আমি ভালাে একজন রাজা পাঠিয়ে দিচ্ছি তােমাদের। 

বাঘাব্যাঙকে আর তখন ধরে কে! তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে সে অমনি ফেরার পথ ধরল। খুশির চোটে ইন্দ্রকে একটা প্রণাম করে আসার কথাটাও সে বেমালুম ভুলে গেল।

 বাঘাব্যাঙের মুখে খবর পেয়ে সবাই যখন জলার ধারে ভক্তিভরে অপেক্ষা। করছে আর রাজার পথ চেয়ে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকাচ্ছে, তখন স্বর্গ থেকে মস্ত একটা শালকাঠের গুঁড়ি ঝপাৎ করে এসে পড়ল জলার মাঝখানে। বাপরে, সে কী আওয়াজ! শুনে তাে পিলে চমকে গেল সকলের। যা জোর আওয়াজ শুনে মনে হয়, খুব কড়া রাজা হবে নিশ্চয়ই। দারুণ ভয় পেয়ে। সবাই সেই যে জলের তলায় গিয়ে লুকোল, ওপরে আর উঠতেই চায় না। অনেকক্ষণ পরে যখন চারদিকের জল আগের মতাে শান্ত হয়ে এল, সাহস করে তখন এক একজন ভেসে উঠতে শুরু করল ওপরে। ভয়ে ভয়ে দূর থেকে তারা রাজাকে দেখতে লাগল। বিশাল একটা কাঠ, দিব্বি চিৎ হয়ে জলের ওপর ভেসে আছে কেমন! চিতেব্যাঙ বলল, হ্যা, রাজা বটে একখানা! এত বড়াে রাজা কিন্তু আর কোথাও নেই। কুনােব্যাঙ বলল, ভারী শান্ত আমাদের রাজামশাই। কোনও নড়নচড়ন পর্যন্ত। নেই। মনে হয়, যেন টেনে ঘুম মারছেন। 

 একটা ফচকে ব্যাঙ হঠাৎ বলে উঠল, রাজার পিঠটা কেমন চওড়া দেখেছ। বিষ্টিতে ঘরদোর ডুবে গেলে রাজার পিঠে চড়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে বেশ। কয়েকদিন। তাই তাে, তাই তাে! কী মজা! বলতে বলতে কয়েকটা পুঁচকে ব্যাঙ অমনি লাফিয়ে উঠে পড়ল রাজার পিঠের উপর। তবু রাজার কোনও রাগ নেই। 


কিন্তু যে রাজা নড়ে না, চড়ে না, রা-টি কাড়ে না, সবসময় চিৎ হয়ে জলে। ভেসে থাকে কেবল, তেমন জড়ভরত রাজাকে নিয়ে কাদেরই বা পােয়। কিছুদিনের মধ্যেই কানাকানি, ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। শেষকালে খােলাখুলি আলােচনা। সবাই বলাবলি করতে লাগল, এমন রাজার চেয়ে কোনও রাজা না থাকাই ভালাে। মিছিমিছি জলার খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে। মেঠোব্যাঙ বলল, বােকা পেয়ে আমাদের ঠকিয়েছেন ইন্দ্ৰঠাকুর।

 কেঠোব্যাঙ বলল, এমন জানলে কে যেত তার কাছে! হেটোব্যাঙ বলল, আমাদের এমন অপমান করার মানে হয় কোনও! শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, নতুন রাজার জন্য আবার দরবার করা হবে ইন্দ্রদেবের কাছে। এবার দূত করে পাঠানাে হল কথাবার্তায় চৌকস এক কটুকি ব্যাঙকে। সে গিয়ে ইন্দ্রের পায়ের কাছে কেঁদে-ককিয়ে বলতে লাগল, কী একটা মরা রাজা পাঠিয়েছেন, হুজুর। মান-ইজ্জত আর কিছু রইল না আমাদের। দয়া করে আপনি একজন ভালাে রাজার ব্যবস্থা করে দিন, নইলে কিন্তু নড়ছি না এখান থেকে। ব্যাঙগুলাে তাে ভারি সেয়ানা হয়েছে আজকাল ! ইন্দ্র হেসে বললেন, আচ্ছা- আচ্ছা, আমারই ভুল হয়েছে। এবার একজন নতুন রাজা পাঠিয়ে দিচ্ছি। খু-উ-ব ভালাে রাজা, দেখতেই পাবে তােমরা। 

এবার ব্যাঙদের রাজা হয়ে এল মস্ত এক পকাল মাছ। ইন্দ্র ঠিকই বলেছিলেন। সত্যি এমন ভালাে রাজা আর হয় না। কাউকে সে বকে না, ঝকে , ধমকায় না, চেঁচায় না, শাসন পর্যন্ত করে না। দেখা হলেই অমনি সে হেসে কথা বলে, কী গাে ব্যাঙের পাে, আছ কেমন?

কিন্তু এত ভালােমানুষ বােধহয় ভালাে নয়। রাজার সঙ্গে প্রজাদের যে। কোনও তফাত থাকে না তাহলে! যে রাজাকে কেউ ভয় পায় না, সে আবার রাজা কীসের! দেখতে দেখতে আবার সবাই বলাবলি শুরু করল, দূর দূর, এ আবার একটা রাজা নাকি? এ তাে ব্যাঙেরও অধম। আমাদের নতুন রাজা চাই। আবার দূত গেল ইন্দ্রদেবের কাছে। এক ধড়িবাজ বামনে-ব্যাঙ। তাদের আস্পর্ধা দেখে ইন্দ্র তাে এবার রেগেই আগুন। বড় বাড় বেড়ে গেছে তাে ওই ত্যাদড় ব্যাঙগুলাের। ভালাে করে ওদের একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। ইন্দ্র চটেমটে মস্ত একটা সারস পাখিকে তাদের রাজা করে পাঠিয়ে দিলেন। বাছাধনেরা এবার বুঝুক ঠ্যালাখানা!

 জলার ধারে পৌঁছেই দারুণ হম্বিতম্বি শুরু করে দিল সারস। কোথায় রাজপ্রাসাদ ? কোথায় সিংহাসন ? ভালাে ভালাে খাবার-দাবারই বা কোথায় ? রাজার কি খিদে-তেষ্টা কিছু পাবে না নাকি! রেগেমেগে মুখের কাছে গােটা চারেক গােদা গােদা ব্যাঙকে ধরে তক্ষুনি খেয়ে ফেলল সারস। 

তাই দেখে তাে সবার আক্কেল গুড়। রাজার ভয়ে সবাই থরথর করে কাঁপতে লাগল। অমনি সারস তাদের জোর ধমক লাগাল, হাঁ করে দেখছ কী সব? যাও, ভালাে একটা জায়গা দেখে আমার থাকার ব্যবস্থা কর আগে। আর হ্যা, রােজ দু-বেলা খাবারের সময় আমার চারটে করে গােদা ব্যাঙ চাই কিন্তু। কথাটা মনে থাকে যেন। 

তখনকার মতাে বাকি ব্যাঙগুলাে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচল বটে, কিন্তু আর বেশিদিন তারা টিকতে পারল না। জলার শেষ ব্যাঙটা যেদিন সারসের। পেটে পড়ল, সেদিন ওই সাদাসিদে পাঁকাল মাছটাই তার একমাত্র সাক্ষী ছিল।

Post a Comment

0 Comments