Lion's disease of horses. - A story of Lion


সিংহরাজের ঘােড়ারােগ। 

 সারা বন জুড়ে উৎসবের ধুম পড়ে গেল সেদিন। সত্যি বলতে কি, বনের পশু-পাখিরা অনেকদিন এমন ধুমধাম দেখেনি। এমন আনন্দ করেনি। পশুরাজ সিংহমশাই এখন বুড়াে হয়েছেন। তার ছেলে হল আজ থেকে বনের রাজা। খুব নাচানাচি হল, চেঁচামেচি হল, পেট পুরে ভােজ হল সক্কলের। বাঘ ভালুক গণ্ডার থেকে হাতি ঘােড়া গরু গাধা কেউ বাদ পড়ল না—এমনকি কাক চিল চড়ুই পর্যন্ত। ভারী খুশি বনের সব্বাই। 

 আরও খুশি হল তারা, যখন নতুন রাজা সবাইকে জানিয়ে দিল, বনের প্রজাদের মুখ চেয়ে আজ থেকে রােজ সে একটার বেশি পশু মারবে না। সংসার-খরচের জন্য দু-বেলা দু-ঝুড়ি মাংস হলেই চলে যাবে তার। 

নতুন রাজার কথা শুনে চারদিকে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, এমন ধার্মিক রাজা আর হয় না। 

রাজার কথা শুনে একটা ধূর্ত শেয়াল ভাবল, ধার্মিক না ঘােড়ার ডিম ! নতুন রাজাটা আসলে আস্ত বােকারাম একটা। ভালােই হল, এই বােকা হাঁদাটার একটু মন জুগিয়ে চলতে পারলে তার কোনও কষ্ট থাকবে না। ওর ঘাড়ে বসেই দু- বেলা দুটো ভালাে-মন্দ পেটে পড়বে, খারাপ কি! কত বাঘা বাঘা জানােয়ারকে সে ঘােল খাইয়ে ছেড়েছে, আর এই হাঁদাটাকে জপাতে কতক্ষণ!

শেয়াল তখন করল কি, রােজ সিংহের শিকারে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে। সামনের দু-পা জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকত ঠিক। যেন কত তার রাজভক্তি! প্রথম কয়েকদিন সেটা খেয়ালই করেনি সিংহ। পরের দিকে তাকে দেখেও 

নিজের খেয়ালে চলে যেত। কিন্তু রােজ রােজ একটা জানােয়ারকে ঠিক এক জায়গায় একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার খুব অবাক লাগল। ব্যাপার কী? কিছু কি বলতে চায় শেয়ালটা? নাকি অন্য কিছু? রাজা হিসেবে ব্যাপারটা একটু জানা দরকার। পরের দিন সকালে শিকারে যাওয়ার পথে আবার সেই শেয়ালটার সঙ্গে দেখা। ভক্তিতে গদগদ হয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে পথের ধারে। তাকে দেখে। সিংহ সেদিকে এগিয়ে যেতেই শেয়ালটি অমনি মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। মস্ত একটা প্রণাম করল। সিংহ খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করল, কিছু বলবে আমাকে? ১১/ আগে থেকেই শেয়ালের ফন্দি আঁটা ছিল। বিনয়ে গলে গিয়ে 

সে জানাল, না মহারাজ। শুধু আপনাকে একবার দেখার জন্যই আমি রােজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকি। কোনও দোষ হলে আমাকে মাপ করবেন, হুজুর। শেয়ালের কথা শুনে সিংহ তাে মুগ্ধ একেবারে! তবু কৌতূহল চাপতে না পেরে সিংহ আবার জিজ্ঞেস করল, রােজ রােজ আমাকে দেখতে আসার দরকারটা কী? শেয়াল মাথা হেঁট করে বলল, আজ্ঞে, এটা আমাদের বংশের নিয়ম। 

 নিয়ম কেন? অবাক হয়ে শুধাল সিংহ। শেয়াল বলল, কিছু মনে করবেন না, হুজুর। আমার পূর্বপুরুষরা এই বনে মন্ত্রীত্ব করত। রাজা ছিলেন তাদের কাছে সাক্ষাৎ দেবতা। রাজ-দর্শন না করে তারা। কোনও কাজেই হাত দিত না। কিন্তু, হুজুর, আপনার ঠাকুরদার আমল থেকে আমাদের মন্ত্রীত্ব চলে গেছে। তবু রােজ একবার রাজ-দর্শনের অভ্যেসটা আমরা ছাড়তে পারিনি। 

সিংহ তাে বেজায় অবাক! এসব কথা সে জন্মেও শােনেনি! জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ তােমাদের মন্ত্রীত্ব গেল কেন শুনি? 

শেয়াল বলল, আজ্ঞে হুজুর, আপনার ঠাকুরদা, বাঝ—এঁরা সবাই ছিলেন মস্ত পণ্ডিত। আমাদের মতাে সামান্য শেয়ালের বুদ্ধি তাদের দরকারই হত না। আপনিও তাে তেমনি জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিমান। বনের সবাই একবাক্যে আপনার। গুণগান করে। আমাদের মন্ত্রীত্ব গেছে, তাতে দুঃখ নেই। রােজ একবার করে যে আপনার দর্শন পাচ্ছি, এই অনেক ভাগ্যি! এমন তােষামােদ শুনে কে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে! সিংহের তাে সত্যি সত্যি মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়। শেয়ালের কথায় গলে গিয়ে সিংহ বলল, ছি ছি, এ ভারি অন্যায়। মন্ত্রী না থাকলে রাজাকে মানায় নাকি! আজ থেকে আমি আবার তােমাকে মন্ত্রী করলাম। এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে সব সময়। 

শেয়াল দেখল, এবার বাজি মাত্। তবু একবার লােক-দেখানাে আপত্তি করে বলল, কী দরকার, মহারাজ! আপনার বাবা হয়ত আপত্তি করতে পারেন। আরে না না, বাবাকে সব বুঝিয়ে বলব আমি। এখন চলাে দেখি আমার সঙ্গে শিকারে। সিংহ প্রায় টেনে নিয়ে চলল শেয়ালটাকে তার সঙ্গে সঙ্গে। বুড়াে সিংহ তাে এসব শুনে আকাশ থেকে পড়ল। ছেলেকে বলল, এত বচ্ছর রাজ্য চালিয়ে কেশরের চুল পাকিয়ে ফেললাম, কিন্তু মন্ত্রী-টন্ত্রির কথা তাে কখনাে শুনিনি। মন্ত্রীর দরকার হলে বাঘ ভালুক—এসব উঁচু জাতের জানােয়ারদের নাও বরং। ওই ছােটোজাতের শেয়ালটাকে একদম পাত্তা দিও না। 

কিন্তু বুড়াে বাপের কথা শুনছে কে! শেয়ালের ভক্তির চোটে নতুন রাজা তাে। কাবু একেবারে। বাপকে সে বােঝাল, তুমি কিচ্ছু ভেবাে না। এ শেয়ালটা ভারী। ভালাে কিন্তু। 

শেয়ালকে এখন আর পায় কে! রাজার ঘাড়ে দিব্বি খায়দায়, আর বনের। মধ্যে ওস্তাদি করে বেড়ায়। কাজের মধ্যে রােজ একবার রাজার সঙ্গে শিকারে যাওয়া। আর সুযােগ বুঝে দুটো মন-জোগানাে কথা—এই তাে! ব্যস্, তার এখন লেজ ফুলে কলাগাছ হওয়ার জোগাড়। ছেলেপুলে নিয়ে সে মহাসুখে ঘর-সংসার করছে এখন। 

কিন্তু সিংহের এই এক ভারী বদরােগ, রােজ একটার বেশি শিকার কিছুতেই সে করবে না। দু-দুটো পরিবারের এতে ভালাে করে চলে কখনও? কিন্তু সেকথা হাঁদারাম বুঝলে তাে! শিকারে যেতে যেতে শেয়াল একদিন খুব দুশ্চিন্তার ভান করে সিংহকে বলল, আপনি কিন্তু কিছুদিন ধরে বেশ রােগা হয়ে যাচ্ছেন, মহারাজ। আপনার এখন। একটু ভালাে খাবারদাবার দরকার। নইলে রাজ্য চালাবেন কী করে? নিজের শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে শুনে কার না চিন্তা হয়! সিংহ মুখ শুকনাে করে বলল, তুমি বােধহয় ঠিকই ধরেছ। শরীরটা সত্যি একটু সারানাে দরকার। কিন্তু কী খাই বলাে তাে? শেয়াল অমনি বলে উঠল, ও সব আজেবাজে পশুর মাংস খাওয়া ছাড়ুন। তাে। এখন কিছুদিন আপনি ঘােড়ার মাংস খান। ওগুলাে যেমন পুষ্টিকর, তেমনি মিষ্টি। 

বলতে বলতে শেয়ালের নিজের মুখেই। প্রায় জল এসে যায় আর কী! আহা, কতদিন যে ও-সব মাংস মুখে পড়েনি তার। একটু ভালােমন্দ খাবারই যদি না কপালে জোটে তাে, ছাই মন্ত্রীত্ব কীসের! সিংহ বলল, ঘােড়ার মাংস এখন পাই কোথায়? এ বনে তাে কোনও ঘােড়া পাওয়া যায় না। শেয়াল বলে উঠল, সে ভার আমার। আপনি চলুন দেখি আমার সঙ্গে। আমি ঠিক ঘােড়া খুঁজে দেব। 

সেই বনের বাইরে ছিল এক বিশাল মাঠ। রাজবাড়ির কয়েকশাে ঘােড়া। রােজ সেখানে ঘাস খেতে আসত। আর কী সব দারুণ চেহারা তাদের। রাজবাড়ির ঘােড়া তাে, তাই যেমন বড়ােসড়াে, তেমনি নধর গােলগাল। শেয়াল দূর থেকে সিংহকে দেখিয়ে দিতেই আর কথা নেই। একলাফে মস্ত একটা ঘােড়ার ঘাড় মটকে বাড়ি নিয়ে এল সিংহ আর শেয়াল। 

বুড়াে রাজা সেদিন খেতে বসে বলল, এ যেন ঘােড়ার মাংস মনে হচ্ছে। তুমি আবার এ বনে ঘােড়া পেলে কোত্থেকে? ছেলে অমনি হেসে জবাব দিল, বনের ধারে রাজার ঘােড়া চরতে আসে, সেখান থেকে মেরে এনেছি একটা। রােজই তাে সেই একই খাবার খাও, আজ তবু একটু মুখ বদল হল। এ নির্ঘাৎ সেই হতচ্ছাড়া শেয়ালটার বুদ্ধি! বুড়াে গম্ভীর মুখে বলল, কাজটা তুমি কিন্তু ভালাে করনি, বাপু। রাজার জিনিস নষ্ট করলে রাজাও আমাদের সহজে ছাড়বে না, বলে রাখছি। 

সে তােমাকে অত ভাবতে হবে না। সিংহ বাপকে বােঝাতে লাগল, তুমি এখন বুড়াে হয়েছ। খাওদাও একটু ভালাে করে। 

এদিকে মাঠ থেকে রােজ একটা করে ঘােড়া উধাও হচ্ছে দেখে রাজা মাঠে ঘােড়া চরানাে একেবারে বন্ধ করে দিল। সিংহ বলল, যাক গে, ও নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই। যা হােক, ক-দিন তাে আয়েস করে ঘােড়ার মাংস খাওয়া। গেল। শেয়াল কিন্তু অত সহজে ছাড়বার পাত্র নয়। দিনে দিনে তার লােভ আরও বেড়ে গেছে বরং। সে চালাকি করে বলল, না মহারাজ, আপনার শরীরটা এখনও ঠিক সারেনি। আরও কয়েকদিন খেতে পারলে ভালাে হত। দেখি, কী। ব্যবস্থা করা যায়। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সন্ধেবেলায় শেয়াল ফিরল ঘােড়ার খোঁজখবর নিয়ে। ঘােড়ারা আছে রাজার আস্তাবলে। রাত্তিরবেলা সেখানে ঢুকে শিকার ধরতে হবে। শেয়াল জানাল, আপনার কোনও চিন্তা নেই। পথ-ঘাট আমি সব জেনে এসেছি। সাবধানে সেখানে নিয়ে যাব আপনাকে। কোনও অসুবিধে হবে না। 

এই ক-দিনে সিংহেরও খুব লােভ বেড়ে গেছে। শেয়ালের বুদ্ধিতে পড়ে রােজ রাত্তিরে সে আস্তাবল থেকে ঘােড়া মারতে শুরু করল। বেগতিক দেখে রাজা তখন পাহারা বসালেন আস্তাবলে। তির-ধনুক নিয়ে দু-জন পাহারাদার। পাঁচিলের আড়ালে লুকিয়ে রইল। সিংহ বা শেয়াল—কেউই অতশত জানে না। রােজকার মতাে রাত্তিরে সিংহ যেই লাফিয়ে পাঁচিল ডিঙোতে যাবে, অমনি দু- দিক থেকে ছুটে এল দুটো বিষ-মাখানাে তির। এ-ফেঁড় ওফোড় করে দিল সিংহের বুক-পিঠ। পাঁচিলের নীচে গড়িয়ে পড়তে না পড়তেই অক্কা পেল সিংহ- বেচারা। 

শেয়াল তাে অমনি পড়ি কি মরি করে দে ছুট। বনের মধ্যে এসে রটিয়ে দিল, সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে গেছেন সিংহরাজ। আর কোনওদিন ফিরবেন না।

Post a Comment

0 Comments