Our Girl Legend Matangini Hazra - The Power Girl


মাতঙ্গিনী হাজরা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার মেদিনীপুর একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে । মাত্র পনের বছর বয়সে এই জেলারই বীর সন্তান ক্ষুদিরাম স্বাধীনতা সংগ্রামে যােগ দিয়ে ফাসির। দড়ি গলায় পরেছিলেন হাসিমুখে । আবার আগস্ট বিপ্লবের অগ্রদূত এই মেদিনীপুরের। বিপ্লবীরাই। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই ব্রিটিশ শাসকদের কড়া নজর পড়ে এই জেলাটির উপর। তারা আইন করে ওখানকার কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করে দেয়। মােটর, সাইকেল, নৌকা ইত্যাদি যানবাহনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে । উদ্দেশ্য অন্যান্য স্থান থেকে মেদিনীপুরকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু তাতে বিপ্লবীদের কাবু করা গেল না । গােপনে পরামর্শ করে তারা এর প্রতিকারের কথা ভাবতে লাগলেন । দূর দূরান্তরে খবরাখবর আদানপ্রদানের জন্য গড়ে তুললেন এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। এর নাম দেওয়া হলাে বিদ্যুৎবাহিনী । দেশের সাহসী যুবকদের নিয়ে এই বাহিনী গড়ে উঠল। ক্রমশ এই বাহিনীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় সাড়ে পাচ হাজারে পৌঁছেছিল।

এই বিদ্যুৎবাহিনী পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে নানা কৌশল অবলম্বন করে ব্রিটিশ শাসকদের। নানাভাবে পর্যুদস্ত করার পরিকল্পনা নিলেন। তারা ভেঙে দিলেন সেতু, ছিন্ন করলেন টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের যােগাযােগ। বড় গাছ ফেলে বিচ্ছিন্ন করলেন সড়ক যােগাযােগ । এই পরিস্থিতিতে বােম্বাই-এ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসল। ১৯৪২-এর ৮ই আগস্ট মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ইংরাজদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হলাে । ইংরাজ, ভারত ছাড, কুইট ইন্ডিয়া, গান্ধীজী সংকল্প বাক্য উচ্চারণ করলেন, ডু অর ডাই, করেঙ্গে ইয়ে। সময়ে মেদিনীপুরীর নেতৃবৃন্দ। ফলে এলেন, গান্ধী, মরেঙ্গে। সারা দেশে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল । গ্রেপ্তার হলেন, গান্ধী, জওহরলাল, মৌলানা আবুল কালাম প্রমুখ প্রথম শ্রেণীর নেতৃবৃন্দ। ফলে গর্জে উঠল সারা দেশ ।

আগেই বলেছি এ সময়ে মেদিনীপুরও পিছিয়ে রইলাে না। নেতারা স্থির করলেন ২৯শে সেপ্টেম্বর একটি গােপন বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে প্রকাশ্যভাবে মেদিনীপুরের বিদ্যুবাহিনী বিপ্লব ঘােষণা করলেন। তারা স্থির করলেন একে একে সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি তারা দখল করবেন। 

স্থির হলাে তমলুক শহরের চারদিক থেকে চারটি মিছিল এগিয়ে আসবে থানা ও আদালত প্রাঙ্গণের দিকে । ঘিরে ফেলবে থানা আর আদালত। সেখানে তােলা হবে ভারতের ত্রিবর্ণশােভিত জাতীয় পতাকা।

এই চারটি মিছিলের একটির পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছিল তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরার উপর। মাতঙ্গিনী বাস করতেন তমলক থেকে সাতমাইল দূরের একটি গ্রামে। জন্ম। ১৮৬৯ সালে। ১৯০৮ সালে যখন ৩৯ বছর বয়স তখন শুনেছেন ক্ষুদিরামের ফাসির কথা। যে ক্ষুদিরামের জন্ম এই মেদিনীপুরেরই মাটিতে । মাত্র উনিশ বছর বয়সের এই তরুণের দেশপ্রেম। ও আত্মত্যাগ মাতঙ্গিনীর শান্ত গৃহস্থ জীবনকে ভীষণভাবে আলােড়িত করে। পরবর্তীকালে তারই সমবয়সী মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন। গ্রামের মেয়ে ও মহিলাদের নিয়ে অবসর সময়ে গান্ধীজীর আদর্শ ও পথনির্দেশ নিয়ে তিনি আলােচনা করতেন। গান্ধীজীর প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস । তাই গ্রামের লােকজনের কাছে তিনি গান্ধী বুড়ি । আদর করে গ্রামবাসীরা তাকে ঐ নামেই ডাকতেন। 

মাতঙ্গিনীর বড় ইচ্ছা দেশের এই বিরাট কর্মযজ্ঞে তিনিও কিছু একটা করেন। এই মেদিনীপুরের মাটিতেই কত কাণ্ডই না হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের নির্মম অত্যাচারে কতশত প্রাণই লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। বাংলার কত সােনার ছেলের রক্তে রাঙা হচ্ছে মেদিনীপুরের মাটি । 

অবশেষে এলাে সেই দিন। ১৯৪২ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর । তমলুক শহরের উত্তর দিক দিয়ে এগিয়ে এলাে এক বিরাট মিছিল । নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কয়েক হাজার মানুষ এই মিছিলে সামিল হয়েছেন। ইতিপূর্বে আরও তিনদিক থেকে তিনটি মিছিল পৌঁছে গেছে। ক্ষিপ্ত উন্মত্ত জনতা সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলাে—ডাকঘর, অফিস, ডাকবাংলাে, ম্যাজিস্ট্রেটের বাসগহ ঘিরে ফেলেছে। এবার থানা দখল করার জন্য অগ্রসর হল। ফলে সশস্ত্র পুলিশবাহিনীর সঙ্গে শুরু। হলাে সংগ্রাম। গুলির আঘাতে এক এক করে লুটিয়ে পড়ছে বিপ্লবীরা। কিন্তু পিছু হটছে না প্টেম্বর একটি

 উত্তরদিক হতে আসা মিছিলের সামনে রয়েছেন মাতঙ্গিনী। হাতে জাতীয় পতাকা ৷৷ মুখেবন্দে মাতরম, ইংরাজ ভারত ছাড়। সারা শহর কাপিয়ে প্রতিধ্বনিত হলাে : ইংরাজ, ভারত ছাড়।

কিন্তু থানার বেশ কিছু আগেই এক বিরাট সৈন্যবাহিনী মিছিলের গতিরােধ করল এবং নির্বিচারে লাঠি ও গুলি চালাতে লাগল। কিন্তু তাতে ভয় পেলেন না তিয়াত্তর বছরের সেই। বৃদ্ধা। হঠাৎ থমকে গেলেন পুলিশ অফিসার । এ তিনি কি দেখছেন ! দীর্ঘদেহী আশীতিপর পক্ককেশ সমন্বিতা এক বৃদ্ধা মিছিলের পুরােভাগে ! যে বয়সে অথর্ব হয়ে নারীরা শয্যা নেন সেই বয়সে এই বীরাঙ্গনা প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণা ! এ যে সত্যিই অবিশ্বাস্য। ‘থামুন, আর এগােবেন না। তা হলে গুলি করতে বাধ্য হবাে। সাবধান করে দিলেন পুলিশ অফিসার। কিন্তু হাতের পতাকা দৃঢ় মুষ্টিতে চেপে ধরে এগিয়ে গেলেন মাতঙ্গিনী। একটি গুলি তার কানের পাশ ঘেঁষে বেড়িয়ে গেল । আবারও সাবধান করলেন সেনা প্রধান। কিন্তু আরও কয়েক পা এগিয়ে গেলেন মাতঙ্গিনী। মুখে তার সেই—‘বন্দেমাতরম, ভারত ছাড়’ ধ্বনি। এবার একটি গুলি মাতঙ্গিনীর হাতে এসে লাগল । কিন্তু তা সত্ত্বেও ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা তার হস্তচ্যুত হল না। অন্য হাতে সেই পতাকা নিয়ে আরও এগিয়ে চললেন তিনি দৃপ্ত পদক্ষেপে । পেছনে মিছিলের সমুদ্র আকাশ বাতাস কাপিয়ে চিৎকার করে। উঠল, বন্দেমাতরম ।

 মাতঙ্গিনীর সাহসে অনুপ্রাণিত হয়ে মিছিল ভেঙে দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকরা এগিয়ে এলাে। গত্যন্তর না দেখে পুলিশ তখন নির্বিচারে গুলি চালাতে লাগল । মুহূর্তের মধ্যে বেশ কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে ।

 মাতঙ্গিনী রক্তাক্ত দেহে এগিয়ে চলেছেন । রক্তপাতে শরীর দুর্বল হয়ে আসছে। তবুও শক্ত হাতে পতাকা চেপে ধরে টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছেন। এবার হঠাৎ একটি গুলি এসে তার বুকে বিঁধল ।

 ‘বন্দেমাতরম্' বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন মাতঙ্গিনী । সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হলাে তার। কিন্তু তখনও তার হাতের বজ্রমুষ্টিতে ধরা আছে ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। মৃত্যুর মহুর্তেও তিনি তা তার হাতছাড়া করেন নি।

তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধা বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনীর এই জুলন্ত দেশপ্রেম ভারতবাসী কোনদিন ভুলবে না। আর সেদিন তারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শত শত বাঙালি তথা ভারতীয় নারী এই মুক্তি সংগ্রামে নির্ভয়ে তাদের ভায়েদের পাশে দাড়াতে পেরেছিল। দেশপ্রেমের এই দৃষ্টান্ত ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে সত্যিই বিরল।

Post a Comment

0 Comments