Sister Nivedita - A Teacher


ভগিনী নিবেদিতা

তখন ১৮৯৯ সাল । প্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ল কোলকাতার বাগবাজার অঞ্চলে । বিশেষ করে শহরের বস্তি ও অনুন্নত পাড়াগুলােতে এ রােগের প্রাদুর্ভাব সত্যিই ভয়ঙ্কর। দলে দলে লােক আক্রান্ত হলাে। মারা পড়ল অনেক । আতঙ্কগ্রস্ত নরনারী ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে লাগল । কিন্তু কজন পালাবে ? পালিয়ে যাবেই বা কোথায় ? সে সংগতিই। বা কজনের আছে ! 

এই যখন অবস্থা তখন আমরা দেখি এক কোমলপ্রাণা সেবাব্রতী মহিলাকে। গায়ে ফুলহাতা। সাদা জামা, পরনে সাদা আলখাল্লা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা । সংকট মুহূর্তে যেন মুর্তিমতী। করুণারূপে তিনি এসে দাড়ালেন ভয়ার্ত বস্তিবাসীর পাশে। সেবা ও যত্নে তাদের সারিয়ে তুলতে। লাগলেন।

বললেন, কোনাে ভয় নেই। আমরা আছি তােমাদের পাশে । যে ভাবে বলবাে সেভাবে চলাে। কতকগুলাে নিয়ম পালন করাে। তাহলেই এ রােগের হাত থেকে তােমরা বাচবে।

 তিনি তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে নােংরা আবর্জনাময় অঞ্চলকে পরিষ্কার করে ঝকঝকে করে। তুললেন । টীকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলাে। দেখা গেল কিছুদিনের মধ্যেই রােগের ভয়াবহতা কমে এল। অসহায় দরিদ্র মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাচল।

 এই কোমলপ্রাণা হলেন ভারত ভগিনী নিবেদিতা । যাকে ত্যাগ ও সেবার ব্রতে দীক্ষা দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ভারত মাতার চরণে নিবেদন করেন এবং নাম দেন নিবেদিতা। নিবেদিতার জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৮৬৭ খ্রীস্টাব্দের ২৮শে অক্টোবর। তার আসল নাম মার্গারেট এলিজাবেথ নােবেল । পিতা একজন ধর্মযাজক । তিনি ছিলেন উদার, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক। মায়ের নাম ইসাবেল । তিনিও ছিলেন নানা গুণের আকর। মার্গারেটের শৈশব কাটে তার ঠাকুরমার কাছে। ঠাকুমা ছিলেন ধীর, স্থির ও করুণাময়ী মহিলা। অনাথ বালিকাদের আশ্রয়স্থল। নিবেদিতার চরিত্র গঠনে তার ঠাকুরমার প্রভাব অপরিসীম। 

পিতা সামুয়েলের আর্থিক অবস্থা মােটেই ভাল ছিল না। তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতাে। ফলে তার শরীর খুব শীঘ্রই ভেঙে পড়ে। তিনি যখন মারা যান তখন নিবেদিতার বয়স মাত্র দশ বৎসর। বাবা মারা যাওয়ার পর সমস্ত দায়দায়িত্ব এসে পড়ে মা ইসাবেলার উপর। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর মার্গারেটকে হ্যালিফ্যাক্স কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হয় । সেখানে তার তীক্ষ্ণ মেধা ও অধ্যবসায় সকলকে মুগ্ধ করে। কাজেই সকলের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন তিনি। বাইবেল চর্চা, সংযম ও আত্মশাসনের মাধ্যমে নিজের চরিত্রকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। সাহিত্য, সঙ্গীত ও কলাবিদ্যাতেও বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন মার্গারেট। বিজ্ঞানেও তার কৌতুহল ছিল অসীম। 

কলেজের শিক্ষা শেষ করে মার্গারেট শিক্ষকতা বৃত্তিকেই তার জীবনের আদর্শ হিসাবে বেছে নেন। আর আংশিক সময়ের জন্য একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা । শিক্ষার প্রতি ছিল তার প্রবল অনুরাগ। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে শিক্ষা সংস্কারে ব্রতী হলেন মার্গারেট । তার মতে শিশুকে এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যে সঞ্জীবিত একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে। ( কিছুদিন পর মার্গারেট প্রথম স্কুল ছেড়ে রেক্সহামের সেকেন্ডারী স্কুলে যােগ দেন। তখন তার বয়স মাত্র একুশ । স্কুলের কাছেই চার্চ । কাজেই অবসর সময়ে চার্চের কাজও তিনি করতেন। বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে আর্ত ও পীড়িত মানুষের সেবা ছিল সেই কাজের অঙ্গ।

 কিন্তু সেখানেও তিনি বেশিদিন থাকলেন না। বদলি হয়ে চলে আসেন চেস্টার শহরে। তারপর সেখান থেকে লন্ডন । লন্ডনের এই স্কুলটি একটি নূতন ধরনের স্কুল । কেবলমাত্র শিশুদের জন্য। সেখানে শিশু শিক্ষা নিয়ে মার্গারেট নানা পরীক্ষানিরীক্ষার সুযােগ পেলেন। তিনিও মনে প্রাণে যেন তাই চাইছিলেন। শিশুদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে গড়ে তুলতে গেলে সাবেকি । শিক্ষার বদলে চাই নতুন শিক্ষাক্রম । যাতে শিশুরা স্বাবলম্বী হয়ে ভবিষ্যতে একজন আদর্শ। সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে। " মার্গারেটের উদ্দম উৎসাহ প্রচুর । আয়ারল্যান্ডকে স্বাধীন করবার জন্য যে বিপ্লবীদল গঠিত হয়েছে তাতে যােগ দিলেন তিনি। সংগঠনের কাজে দৃঢ় উৎসাহ তার। এত কিছু করার পর তিনি প্রচুর পড়াশুনাে, প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। বক্তৃতাতেও তিনি ছিলেন পারদর্শিনী

 স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে মার্গারেটের সাক্ষাৎ ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এতে তা জীবনের গতি যেন একটি স্থির ও গন্তব্যস্থলের লক্ষ্যে পৌঁছালাে। ১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে প্রথম যখন স্বামীজী লন্ডনে আসেন তখন তার ভাষণ শােনা বা সান্নিধ্য পাওয়ার খুব একটা সুযােগ পাননি মার্গারেট । কিন্তু দ্বিতীয়বার অর্থাৎ ১৮৯৬ সালের এপ্রিল মাসে আবার আমেরিকা ঘুরে লন্ডনে এলেন বিবেকানন্দ। এবারে মার্গারেট বিবেকানন্দের খুব কাছাকাছি এলেন। ঘনিষ্ঠ হলেন। শুনলেন ধর্ম সম্বন্ধে নূতন বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা । তার উদার মত ও ভারতীয় অধ্যাত্ম তত্ত্বের সার্বজনীন বিশ্লেষণ তাকে অভিভূত করলাে। তিনি যেন প্রকৃত মুক্তিদাতার সন্ধান পেলেন। স্বামীজী প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তার মনের সমস্ত দ্বিধা ও সংশয় দূর করলেন।

স্বামীজীকে মার্গারেট তার শিশুবিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে দেখালেন । শিশুদের জন্য মার্গারেটের নূতন চিন্তাভাবনা ও দরদ স্বামীজীকে মুগ্ধ করল । তিনি ভারতের অশিক্ষিত অনাথ দুর্ভাগা ছেলেমেয়েদের জন্য মার্গারেটকে আহ্বান জানালেন এগিয়ে আসতে ।

স্বামীজীর আহ্বানে সাড়া দিলেন মার্গারেট । বললেন, আমি আসবাে আপনার পাশে । ভগবানের ইচ্ছাও হয়তাে তাই। প্রেম ও করুণার আহ্বান উদ্বেল করে তােলে মার্গারেটকে। দরিদ্র ও আর্তের সেবায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার দৃঢ় সংকল্প জেগে ওঠে তার মনে। স্বামীজীর ধ্যানের ভারত প্রত্যক্ষ করবার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মােম্বাসা নামক জাহাজে ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি মার্গারেট ভারতের পবিত্র মত্তিকায় পদার্পণ করেন। বন্দরের, জেটিতে স্বামীজী তাকে গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই শুরু। হয় মার্গারেটের জীবনে এক নূতন অধ্যায়। বেলুড় মঠের ঠাকুরঘরে তাকে দীক্ষা দেওয়া হয় । দীক্ষান্তে তার নতুন নামকরণ হলাে—নিবেদিতা। ভারতের কল্যাণে বিবেকানন্দ তার এই বিদেশিনী শিষ্যা তথা মানসকন্যাকে নিবেদন করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তার নাম দিয়েছিলেন নিবেদিতা । সত্যিই এই নাম সার্থক । নিজেকে এমন করে নিঃশেষে নিবেদন করে দেবার ক্ষমতা আর কারাে হয়েছিল কিনা সন্দেহ।

 স্বামীজী স্থির করলেন নিবেদিতাকে আমাদের দেশের নারী সমাজের শিক্ষার কাজের দায়িত্ব দেবেন। গড়ে তুলবেন একটি নারী শিক্ষা নিকেতন। তার সে আশা পূর্ণ হয়েছিল । । 
নিবেদিতা ১৬ নং বােসপাড়া লেনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে লাগলেন । চালাতে থাকেন তার কর্তব্যকর্ম। দুপুরের দিকে মাঝে মাঝে এক আধদিন কাটাতেন শ্রীমার সঙ্গে। ফলে তিনি ভারতবর্ষ ও তার সাধনাকে জানবার সুযােগ পেলেন । শ্রীমা যেন করুণাময়ী সেবাময়ী সাক্ষাৎ ভারতবর্ষ। মাঝে মাঝে বিবেকানন্দ নিবেদিতা ও অন্যান্য শিষ্যশিষ্যাদের নিয়ে বের হতেন ভারত ভ্রমণে। হিমালয়ের কোলে আলমােড়া, কাশ্মীর, অমরনাথ ইত্যাদি স্থান দর্শন করে তিনি আত্মহারা হয়ে যান। বাগবাজারের ছােট্ট বিদ্যালয়টি থেকে শুরু করে নিবেদিতার কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়ে ওঠে সারা ভারতবর্ষে । জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। বিবেকানন্দের এই বাণীকে নিজের উৎসর্গীকৃত কাজের মধ্য দিয়ে সার্থক করে তােলেন নিবেদিতা। অবশেষে ১৯০২ খ্রীস্টাব্দের ৪ঠা জুলাই বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে বিমূঢ় হয়ে পড়েন নিবেদিতা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলেন। কারণ সামনে তার অনেক কাজ। নিবেদিতার কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন একাধারে গুরু, পিতা ও ঈশ্বর । জগৎ আলােড়নকারী শক্তি ; বহুজন হিতায় ও বহুজন সুখায় । কাজেই গুরুদেবের সেই আরব্ধ কার্যকে সম্পূর্ণ করতে হবে, তার স্বপ্নের ভারতবর্ষকে গড়ে তুলতে হবে। 

বিবেকানন্দের তিরােধানের পর বিরাট কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়লেন নিবেদিতা। একদিকে . ভারতের ধর্মসংস্কৃতির উজ্জীবন অন্যদিকে পরাধীন ভারতের মুক্তি । এই মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করলেন নিবেদিতা। ভারতের শিল্পকলার প্রতিও তার ছিল অন্তরের টান। ফলে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল প্রমুখ দিকপাল ব্যক্তিদের সঙ্গে কার্যকারণে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। নিবেদিতা । বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র ছিলেন তার মানসপুত্র । তার বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের সম্পাদনা এবং বিদেশ সফরের জন্য অর্থসংগ্রহও করেছেন তিনি। গােখলে, বালগঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পেয়েছেন তার পরামর্শ। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তার জ্বালাময়ী বক্তৃতা বিপ্লবী তরুণদের দিয়েছে প্রেরণা। উদ্বুদ্ধ করেছে মুক্তি সংগ্রামে। নানা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে, দারিদ্র্যের সঙ্গে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। নিবেদিতা। নিজের সুখ ও শরীরের দিকে নজর রাখার অবসর তার ছিল না। ফলে তার স্বাস্থ্য ক্রমশ ভেঙে পড়ল । স্থির হলাে জগদীশচন্দ্র তাকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য দার্জিলিং নিয়ে যাবেন। কিছুদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার শরীর আরও খারাপের। দিকে গেল। ১৯১১ খ্রীস্টাব্দের ১৩ই অক্টোবর মরদেহ ত্যাগ করে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা। করলেন স্বামীজী তথা সারা ভারতের মানসকন্যা ভগিনী নিবেদিতা । নিজে একজন বিদেশিনী হয়েও ভারত তথা ভারতবাসীদের জন্য তার এই মহান ত্যাগের কথা ভারতের ইতিহাসে। স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন।

Post a Comment

0 Comments