Reveal The waves of the sea, The ocean and tide breaks - All in one

সমুদ্রস্রোত 

 সমুদ্রের জল স্থির নয়। নদীর স্রোতের মতাে সমুদ্রেও স্রোত আছে। সমুদ্রস্রোত দু-ধরনের। সমুদ্রের উপরিতলে যে-স্রোত প্রবাহিত হয় তাকে বলে বহিস্রোত বা সারফেস কারেন্ট। আর সমুদ্রের তলা দিয়ে যে-স্রোত বয়ে যায় তাকে বলে অন্তঃস্রোত বা আনডার কারেন্ট। সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রায় সবসময়ই বাতাস বইতে থাকে। এই বাতাস এবং জলের উম্লতার হেরফের সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। সমুদ্রের। ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস তিন ধরনের হয়—আয়ন বাতাস, পশ্চিমা বাতাস এবং মেরু বাতাস। এই বাতাসের জন্য সৃষ্টি হয় বহিঃস্রোত। পৃথিবীর সব জায়গায় সূর্যের আলাে সমানভাবে পড়ে না। ফলে বিভিন্ন জায়গায় উন্নতা বিভিন্নরকমের হয়। এই উম্লতার হেরফেরের জন্য তৈরি হয়। অন্তঃস্রোত।

প্রতিটি মহাসাগরে একাধিক স্রোত প্রবাহিত হতে দেখা যায়। মনে হতে পারে, যে মহাসাগর যত বড়াে তার স্রোতের সংখ্যাও তত বেশি। তবে, ঠিক তা নয়। প্রশান্ত মহাসাগর সবচেয়ে বড়াে। কিন্তু আয়তনের তুলনায় এর স্রোতের সংখ্যা অনেক কম। তুলনায় আটলান্টিক মহাসাগরে স্রোতের সংখ্যা অনেক বেশি। স্রোতের উৎপত্তিস্থল ও গতিপথ অনুসারে এদের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়েছে। নদীর। যেমন শাখা নদী থাকে অনেক স্রোতের তেমন শাখাস্রোত দেখা যায়। আবার কখনও-কখনও একটি স্রোত অপর একটি স্রোতের সঙ্গে মিশে গিয়ে একসঙ্গে প্রবাহিত হতে থাকে।। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রধান দুটি স্রোত হল জাপান স্রোত ও পেরু স্রোত। এ ছাড়াও আরও কয়েকটি স্রোত হল ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত, বেরিং স্রোত, পূর্ব অস্ট্রেলিয় স্রোত, উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ইত্যাদি। উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন হয়েছে। পরে এটি দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের একটি শাখার সঙ্গে মিলিত হয়ে জাপান উপকূলে প্রবেশ করেছে। তাই এর নাম জাপান স্রোত। পেরু স্রোতের উৎপত্তিস্থল কুমেরু মহাসাগর। বিভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়ে এটি পেরু। উপকূলে চলে আসে। তাই এর নাম পেরু স্রোত। পরে এই স্রোতটি অন্য স্রোতের সঙ্গে মিশে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে। 

সবচেয়ে বেশি স্রোত দেখা যায় আটলান্টিক মহাসাগরে। এত স্রোত আর কোনাে মহাসাগরে দেখা যায় না। এখানকার উল্লেখযােগ্য স্রোতগুলি হল বেগুয়েলা স্রোত, ব্রেজিল স্রোত, উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, ল্যাব্রাডার স্রোত প্রভৃতি।

সুমেরু বা উত্তর মহাসাগর থেকে দুটি স্রোত গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল দিয়ে। প্রবাহিত হয়ে ল্যাব্রাডার উপদ্বীপের কাছে একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। স্রোত দুটির এই মিলনস্থল থেকেই কুয়াশায় ঢাকা ল্যাব্রাডার স্রোতে বিরামহীন বা ল্যাব্রাডার স্রোতের শুরু। স্রোতটি প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং সবুজ রঙের। এটি নিউফাউন্ডল্যান্ডের পাশ দিয়ে এসে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল ধরে দক্ষিণে প্রবাহিত হওয়ার সময় এর পাশ দিয়ে বিপরীত দিকে বয়ে গেছে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত। এর রং গাঢ় নীল। স্রোত দুটি পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও কেউ কারও সঙ্গে মিশছে না। দুটি স্রোতের সীমারেখা খুব পরিষ্কার দেখা যায়। একে বলে হিমপ্রাচীর। এটি দেখতে খুব সুন্দর। তবে জায়গাটা বিপজ্জনক। এখানকার জলে এত ঘূর্ণি যে বড়াে-বড়াে জাহাজ মুহূর্তে তলিয়ে যেতে পারে।

এর কারণ, ল্যাব্রাডার স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈলগুলি উয় স্রোতের প্রভাবে গলতে থাকে। ফলে হিমশৈলগুলির সঙ্গে আসা পাথর বালি, কাদা এখানে জমে-জমে তৈরি করছে মগ্নচড়া। জায়গাটা সবসময় গাঢ় কুয়াশায় ঢেকে আছে। সেইসঙ্গে চলছে বিরামহীন ঝঞা। এই ঝঞা সাইক্লোনের চেয়েও ভয়ংকর। এখানে জলপথে বা আকাশপথে কোনােভাবেই যাওয়া যায় না। এত বিপজ্জনক জায়গা। পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। প্রশান্ত মহাসাগরে ঠাণ্ডা বেরিং স্রোত ও গরম জাপান স্রোত যেখানে মিশেছে সেই অঞ্চলটি অনেকটা এই ধরনের হলেও, এত বিপজ্জনক নয়।। 

এবারে আসি ভারত মহাসাগরের কথায়। এখানে স্রোতের সংখ্যা অনেক কম। এখানকার ঠান্ডা স্রোতগুলির উৎপত্তিস্থল কুমেরু বা দক্ষিণ মহাসাগর।

ভারত মহাসাগরে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব বেশি। এই বায়ুপ্রবাহের দরুন যেসব স্রোতের উদ্ভব হয় সেগুলির মধ্যে সােমালি স্রোত প্রধান। এই স্রোতটি আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর এসে আরব সাগরের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করেছে। শীতকালে এই স্রোতটি উলটোদিকে প্রবাহিত হয়। পূর্ব অস্ট্রেলিয় স্রোতের একটি শাখা বাইরে থেকে এসে এই মহাসাগরে ঢুকেছে। এ ছাড়াও মােজাম্বিক স্রোত আর আগুলাস স্রোত উল্লেখযােগ্য।

 সমুদ্রে জোয়ারভাটা।

 নিজের অক্ষের ওপর পৃথিবী ঘুরছে। একবার ঘুরতে সময় নেয় চব্বিশ ঘণ্টা। তাই পৃথিবীতে বারাে ঘণ্টা দিন ও বারাে ঘণ্টা রাত্রি। প্রতি বারাে ঘণ্টায় সমুদ্রে একবার জোয়ার হয়, আর একবার ভাটা হয়। অর্থাৎ একদিনে সমুদ্রে দুবার জোয়ার হয়, আর দুবার ভাটা হয়। এই জোয়ারভাটা হয় চাদ ও সূর্যের আকর্ষণের জন্য। তবে সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকায় এর আকর্ষণ খুবই কম। তুলনায় চাদের আকর্ষণ অনেক বেশি। তাই বলা যেতে পারে সমুদ্রের জোয়ারভাটায় চঁাদের ভূমিকাই প্রধান। চাদের আকর্ষণে সমুদ্রের জল যখন ফুলে ওঠে তখন তাকে বলা হয় জোয়ার। এই জোয়ার একসঙ্গে পৃথিবীর দু-জায়গায় হয়। পৃথিবীর যে-দিকে চাদ থাকে সেইদিকের জোয়ারকে বলা হয় মুখ্য জোয়ার। আর বিপরীত দিকের জোয়ারকে বলে গৌণ জোয়ার। চঁাদের সামনের দিকের জল যখন ফুলতে থাকে তখন এর সমকোণে থাকা জায়গার জল কমতে থাকে। তাই সেই অঞ্চলে শুরু হয় ভাটা। কিন্তু বিপরীত দিকের জল অত তাড়াতাড়ি কমতে পারে না। ফলে সেই জায়গার জল ফুলে থাকে। তাই সেখানে হয় গৌণ জোয়ার। জোয়ার চলে। প্রায় ছ'ঘণ্টা ধরে। তারপর শুরু হয় ভাটা। অর্থাৎ, জল নামার কাজ। এই কাজটাও চলে ছ’ঘণ্টা ধরে। বারাে ঘণ্টা পরে আবার যখন জোয়ার হয় তখন মুখ্য ও গৌণ জোয়ারের স্থানটা পালটে ভরা কোটাল যায়। 

পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ ঘুরছে। একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় প্রায় 27 দিন। তাই প্রতিদিন চাদের অবস্থান একটু- জোয়ার ভাটা একটু করে সরে যায়। এই কারণে কোনাে একটি জায়গায় প্রতিদিন মরা কোটাল জোয়ারভাটা একই সময়ে হয় না। প্রতিদিন এই সময় বাহান্ন মিনিট করে সরে যায়। প্রতি পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী জোয়ার ভাটা একই সরল রেখায় থাকে বলে পৃথিবীর ওপর চাঁদ ও সূর্যের মিলিত আকর্ষণ কাজ করে। ফলে জোয়ারের তীব্রতা অনেক বেশি হয়। এই জোয়ারকে বলা হয় ভরা কোটাল। আর সপ্তমী-অষ্টমী তিথিতে উঁদ ও সূর্য পৃথিবী থেকে সমকোণে থাকে। তখন জোয়ারের জোর অনেক কম হয়। একে বলা হয়। মরা কোটাল।। 

ভরা কোটালের সময় সমুদ্র থেকে প্রচুর জল নদীতে ঢােকে। এই জলের প্রবাহ নদীর স্রোতের বিপরীত দিকে থাকে বলে নদীতে জলােচ্ছাস দেখা যায়। একে ‘বান’ বলে। নদীর মােহনা যদি শঙ্কু আকৃতির হয় তবে বান খুব তীব্র হয়। হুগলি ও ইয়াং সিকিয়াং নদীর মােহনা এই ধরনের।

সমুদ্রের ঢেউ 

সমুদ্র ভীষণ চঞ্চল। অনবরত ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে উপকূলে। মনে হয় জল যেন এগিয়ে আসছে তীরের দিকে। আছড়ে পড়ে আবার তা ফিরে যায়। কিন্তু। আসল ঘটনা হল জল আন্দোলিত হচ্ছে। সমুদ্রে স্নানের সময় ঢেউয়ের সঙ্গে-সঙ্গে ওঠানামা করলে ঢেউ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় না। একটি সুতাের একপ্রান্ত আটকে অন্য প্রান্ত ধরে নাড়ালে সুতাে যেমন ঢেউয়ের আকারে দুলতে থাকে সমুদ্রের জলও সেরকম দুলছে। 

সমুদ্রের জলে এত ঢেউ হয় কেন? এর অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম কারণ বাতাস। বাতাসের ধাক্কায় সমুদ্রের সমুদ্রের ঢেউ। জল আন্দোলিত হয়। বাতাস যত জোরে বয় সমুদ্রের জলে আন্দোলন তত বেশি হয় এবং ঢেউ ততই উঁচু হয়। ঝােড়াে হাওয়া বইতে থাকলে সমুদ্র অশান্ত হয়ে ওঠে। তখন বড়াে- বড়াে ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ে। ঢেউয়ের মাথাকে চূড়া বলে। উপকূলের কাছাকাছি ঢেউগুলােতে এই চূড়া পরিষ্কার দেখা যায়। উপকূলে ঢেউ আছড়ে পড়ার পর প্রচুর ফেনার সৃষ্টি হয়। 

জোয়ারভাটা থেকেও ঢেউয়ের উৎপত্তি হয়। সমুদ্রের তলায় ভূমিকম্প হলে যে-ঢেউ হয় তা অতি ভয়ঙ্কর। এই ঢেউ জলের নীচ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে থাকে। তীরের কাছে এসে তা প্রায় আট-দশতলা বাড়ির সমান উঁচু হয়ে আছড়ে পড়ে। এর ধাক্কায় তীরের সবকিছু ভেসে যায়। জল নেমে গেলে চারদিকে পড়ে থাকে শুধু ধ্বংসস্তুপ। জাপানের আশেপাশে প্রশান্ত মহাসাগরে এমন ভয়ঙ্কর ঢেউ প্রায়শই দেখা যায়। জাপানিরা এই ঢেউকে বলে ‘সুনামি। 2004 সালের 26 ডিসেম্বর সুনামির ধাক্কায় ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের উপকূলভাগ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। সমুদ্রে মাঝে-মাঝেই নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। তখন প্রবল বেগে ঝােড়াে হাওয়া বইতে থাকে। এর ফলে উঁচু-উঁচু ঢেউয়ের সঙ্গে কখনও-কখনও জলস্তম্ভের সৃষ্টি হয়। এই বিশাল বিশাল জলস্তম্ভগুলি কখনও সমুদ্রের বুকেই ভেঙে পড়ে, আবার কখনও তা ছুটে এসে উপকূলে ঝাপিয়ে পড়ে। আর সেই জলের তােড়ে ভেসে যায় গ্রামের-পর-গ্রাম।

Post a Comment

0 Comments